
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি :কুড়িগ্রামের উলিপুরে পানির অভাবে খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন ধু-ধু বালু চর। বিস্তীর্ণ এলাকায় জেগে উঠেছে চর। ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। বিপাকে পড়েছেন কৃষক। স্বস্তিতে নেই জেলেরাও। এদিকে তিস্তার পানি শুন্যতায় দুই তীরের মানুষ পায়ে হেঁটেই তিস্তা পার হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে চরম দুর্দিন পার করছেন তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা। বিশেষ করে বিপাকে পড়ে যায় শিশু, বয়স্ক ও রুগীরা। অপরদিকে, নাব্যতা সংকটে বর্ষাকালে দেখা দেয় ব্যাপক বন্যা আর নদী ভাঙন। এতে বাড়ে দুর্ভোগ। তিস্তার যৌবন ফেরাতে, লাখ লাখ মানুষের জীবিকার এ উৎসকে চিরচেনা রূপে ফিরিয়ে আনতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।একসময় এই নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করতেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। ধান, গম, ভুট্টা, সবজিসহ নানা রকম ফসল ফলাতেন তারা। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। এখন শুধু হাহাকার।তিস্তা পানিশূন্য চারিদিকে জেগে উঠেছে চর আর চর। নদীতে কোথাও কোমরের নিচে পানি কোথাও হাঁটু আবার পানি শূন্য। পানি সেচ দিয়ে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। ফলে ব্যয় ও শ্রম দুটোই বাড়ছে। লোকসান গুনছেন তারা। জানাযায়, উপজেলায় ৩টি ইউনিয়ন বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এ ৩টি ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি নদী পারাপারের নৌকা ঘাটপার রয়েছে। নদীতে পানি না থাকায় অনেক দূরের বালুপথ পাঁয়েহেঁটে সামান্য পথ নৌকায় পাড়ি দিয়ে আবার পাঁয়ে হেঁটে গন্তব্য স্থলে পৌঁছাতে হয়। এতে করে বিপাকে পড়েতে হয় শিশু, বয়স্ক ও রুগীদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে ৮৪টি চরাঞ্চলে ৬ হাজার ৬ শত ৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করেছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা। পানি না থাকায় ফসল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে দিনদিন। ডিজেল চালিত সেচ পাম্প লাগিয়ে কোন রকম পানি দিচ্ছেন বিভিন্ন চাষাবাদে। এতে করে চরাঞ্চলের কৃষকেদের ব্যায় বেশি হচ্ছে বলে জানান।

সরেজমিনে উপজেলার তিস্তা পাড়ের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতে পানি নেই। এপাড় থেকে পায়ে হেটে ওই পাড়ে অল্প পানিতে নৌকা দিয়ে পাড় হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষজন। নদীর মাঝখানে শুধু চর আর চর। এ ছাড়াও তিস্তা নদীর শাখা-প্রশাখাগুলো শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এসব চরে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করেছেন। চিত্রে দেখা যায় সবুজের সমারোহ। আবার নদী যখন নব্যতা ফিরে পায় তখন তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখ দূর্দশা নেমে আসে। খরা স্রোতে শত শত বিঘা ফসলি জমি বসত ভিটে মাটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। খোলা আকাশের নীচে অনাহারে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। এমতাবস্থায় তিস্তা পাড়ের মানুষ জোর দাবী জানান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের। উপজেলার দড়িকিশোরপুর পানিয়ালের ঘাট এলাকার কৃষক নুরনবী মিয়া বলেন, ভরা তিস্তা নদী এখন শুকিয়ে মরা হয়েছে। যখন নদী ভরে যায় তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখের শেষ থাকেনা। ঘরবাড়ি মাটিভিটে সব নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখন নদীতে পানি নেই ধুঁধুঁ বালুতে পায়ে হেটে পাড়ি দিতে হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও রুগীকে নিয়ে যেতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোর দাবী জানান।এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তিস্তার নাব্যতা সংকট রোধে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে এক প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের আপত্তির কারণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। তাই তিস্তা পাড়ের মানুষ চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। এলক্ষ্যে তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তিস্তার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির উদ্যোগে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলন কর্মসূচি চলমান রয়েছে. উপজেলা চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও পৌর বিএনপি’র সদস্য সচিব সোলাইমান আলী বলেন, উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা নদী। প্রতিবেশী দেশের কারণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আটকে আছে। ফলে এখানে চাষাবাদ ব্যাহতসহ নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মানুষের ওপর। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। আমরা তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন শুরু করেছি। তিস্তাপাড়ে লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, হেঁটে তিস্তা নদীপার, গণসংগীত, তিস্তাকেন্দ্রিক নাটক,সিনেমা প্রদর্শন ও মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দেশ ও বিদেশের শীর্ষ গণমাধ্যম গুলোতে তিস্তার এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মানুষজনের ব্যাপক সমর্থনও পেয়েছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
